
রেলওয়ে টিকিট কালোবাজারি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে একটি বোল্ড প্রস্তাব রেখেছেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে संবোধন করে তিনি মাত্র এক মাসের জন্য পূর্ণ দায়িত্ব ও স্বাধীনতা চেয়েছেন। তাঁর দাবি, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে ঢাকা–কক্সবাজার ও ঢাকা–চট্টগ্রাম—দুটি ব্যস্ততম রুটে টিকিট কালোবাজারি সম্পূর্ণ বন্ধ করার পাশাপাশি ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
কোনো পদ-বেতন চান না, শুধু ক্ষমতা ও একটি গাড়ি
মাহবুব কবীর মিলন তাদের স্ট্যাটাসে স্পষ্ট করেছেন, এই কাজের জন্য কোনো পদ-পদবি, আলাদা চেয়ার-টেবিল কিংবা বেতন-ভাতা প্রয়োজন হবে না। শুধু যাতায়াতের জন্য একটি গাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগে তাঁর নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষমতা চান তিনি। এটি একটি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়বোধ ও সিস্টেমে আস্থার প্রতিফলন, যিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে জনসেবায় ফিরতে চান।
টিকিট কালোবাজারি বন্ধের পরিকল্পনা: যেভাবে কাজ করবে
চুক্তিভিত্তিক জনশক্তি ও যাদবচয়ন পদ্ধতি
তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, চুক্তিভিত্তিক কিছু অবসরপ্রাপ্ত টিকিট পরীক্ষক নিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকেও কাজে যুক্ত করা হবে। এ কাজে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তারও প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো তাঁর প্রস্তাবিত যাদবচয়ন (র্যান্ডম) পদ্ধতি—ট্রেনের প্রতিটি যাত্রীর টিকিট পরীক্ষা না করে প্রতি কোচ থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে যাত্রীদের পরিচয় যাচাই করা হবে।
জরিমানা ও পরিচয়পত্রের নতুন বিধান
টিকিটে উল্লিখিত ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য কেউ ভ্রমণ করলে দ্বিগুণ জরিমানার ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছেন মাহবুব কবীর মিলন। অপ্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীদের টিকিটের সঙ্গে বাবা বা মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যুক্ত করার প্রস্তাও দিয়েছেন তিনি। এছাড়া টিকিট পরীক্ষক, চেকার ও গার্ডদের শরীরে ধারণযোগ্য (বডি-ওয়ার্ন) ক্যামেরা রাখার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ নীতি শতভাগ বাস্তবায়ন করা গেলে অনিয়ম ও কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
টিকিট ইস্যুর সময়সীমা ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান
পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রার তিন থেকে পাঁচ দিন আগে টিকিট ইস্যুর ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে—এই প্রস্তাবটি কালোবাজারীদের হাত থেকে টিকিট নিতে কার্যকর হতে পারে। অন্যায়কারীদের পক্ষে কেউ তদবির বা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার একটি বোল্ড উদাহরণ।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) পুনর্গঠনের প্রস্তাব
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়েও নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মাহবুব কবীর মিলন। তিনি বলেন, বাহিনীটির আইনগত ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে কার্যকর করতে নির্বাহী আদেশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাহিনীটিকে রেল অধিদপ্তরের পরিবর্তে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, বাহিনীটির আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে একে আধুনিক ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
পাথর নিক্ষেপ রোধ ও দেশব্যাপী প্রসারণ
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। পরীক্ষামূলকভাবে নির্ধারিত দুই রুটে সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য রেলপথেও এসব ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন এই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান: ব্যর্থ হলে যেকোনো শাস্তি মেনে নেব
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখেন মাহবুব কবীর মিলন, এক মাসের জন্য তাঁকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এ সময়ে নেওয়া পদক্ষেপ ও অগ্রগতি জনগণকে জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ব্যর্থ হলে যেকোনো শাস্তি মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করে তাঁর প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আলোচনায় একজন প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব
উল্লেখ্য, মাহবুব কবীর মিলন বিভিন্ন সময়ে সরকারি সেবা, ভোক্তা অধিকার ও অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। এবার রেলের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে এক মাসের জন্য দায়িত্ব চেয়ে দেওয়া তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও জনসেবায় প্রতিবদ্ধতা মিলিয়ে তাঁর এই প্রস্তাব কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, তা এখন দেশবাসীদের নজরে থাকবে।
