নেত্রকোনার প্রাণনদী মগড়া একবার আবার জীবন পাওয়ার পথে। প্রায় ৪৯ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে এই ঐতিহাসিক নদীকে পুনর্জীবিত করার জন্য। কিন্তু বাস্তবায়নের আগেই দুটি বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে সামনে—নদীর সীমানায় অবৈধ দখল এবং শহরের নর্দমা ও বর্জ্য থেকে হয়েছে দূষণ। এই দুটি সমস্যা সমাধান ছাড়া শুধু খনন করলেই নদীর প্রাণ ফিরবে না, সেটি বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে 'নেত্রকোনা জেলার অন্তর্গত মগড়া নদী পুনঃখনন প্রকল্প' নভেম্বর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। এডিপি তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪৮৪৯.৭৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। মগড়া নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে ১১৬ কিলোমিটার নেত্রকোনা জেলার আওতাধীন। শহরের ভেতর দিয়ে প্রায় সাত কিলোমিটার প্রবাহিত এই নদীর রাজেন্দ্রপুর-সাকুয়া বাজার থেকে আটপাড়ার সেতুর বাজার পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার পুনঃখননের পরিকল্পনা আপনানো হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে নদীর দুপাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ দখল। জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সিএস খতিয়ান ভিত্তিক ৩৮১টি এবং বিআরএস অনুযায়ী ৪৯টি অবৈধ স্থাপনা শনাক্ত করা হয়েছে। এতে কেন্দ্র করে ১০৪টি উচ্ছেদ মামলা এবং ২০টি দেওয়ানি মামলা চলমান রয়েছে। গত ২ এপ্রিল ২০২৬ জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হলেও দখলমুক্তির কাজ এখনও অনিশ্চিত।
২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্ট নদীর মূল প্রবাহ বিবেচনায় সিএস ও আরএস ম্যাপের ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ছয় মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, সেটি বড় প্রশ্ন।
দখলের পাশাপাশি দূষণ মগড়ার জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি। নেত্রকোনা পৌরসভার ১৩টি নর্দমার পানি সরাসরি নদীতে পড়ছে। বাজার, বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, ক্লিনিকের বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। কাঁচা শাকসবজির বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা, কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য—সবই নদীর পানিকে বিষাক্ত করছে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু খনন করলেই নদী বাঁচবে না; খননের পরও যদি নর্দমা ও বর্জ্য পড়তে থাকে, তবে আবারও পলি জমে নাব্যতা কমবে।
বিশেষজ্ঞরা চারটি বিষয়ে জোর দিয়েছেন: প্রথমে নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্তি, দ্বিতীয়ে নর্দমা ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ, তৃতীয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ, এবং চতুর্থে খননের পর নিয়মিত নজরদারি। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভা, পরিবেশ অধিদপ্তর—সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই প্রকল্প সফল হবে না। স্থানীয় জনগণকেও এই প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে রাখতে হবে।
একসময় মগড়া ছিল নৌপথ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জীবননালা। ধান-পাটসহ নানা পণ্য নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে নৌযান আসত। আজ নাব্যতা কমে গেলে বড় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ। এই প্রকল্প নেত্রকোনাবাসীদের জন্য আশার আলো। কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি দখল-দূষণের চক্র থেকে মগড়া মুক্ত না পায়, তবে তা দেশের সম্পদের অপচয় হবে। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নই এখন মূল পরীক্ষা।