বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, বর্তমান এল-নিনো প্রकोপ ডিসেম্বর মাসে তার চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী এল-নিনোগুলোর একটি হতে পারে এবারের এই পরিস্থিতি। জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ সংস্থার মাসিক 'গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট'-এ প্রকাশিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝপথি ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতিমধ্যে রেকর্ড ভাঙন করা শুরু করেছে।
ডব্লিউএমওর প্রধান সেলেস্তে সাউলো জানিয়েছেন, এল-নিনো ইতোমধ্যেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং খুব দ্রুত আরও শক্তিশালী হচ্ছে। সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ১০০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে এই পরিস্থিতি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বজায় থাকবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ১৩টি শীর্ষ আবহাওয়া কেন্দ্রের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে।
সাউলো স্পষ্ট করেছেন, এল-নিনো পৃথিবীতে নতুন করে কোনো উত্তাপ তৈরি করে না; বরং মহাসাগরে জমে থাকা তাপ মুক্ত করে। বর্তমানে যে মহাসাগর থেকে এই তাপ বের হচ্ছে, সেটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উত্তপ্ত। ফলে সেখান থেকে মুক্ত হওয়ার মতো তাপের পরিমাণও বেশি।
মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা মাপার সূচকটি গত জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ রেকর্ড তৈরি হবে। এর আগে ২০১৫-২০১৬ সালের এল-নিনোর সময় এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়েছিল।
সর্বশেষ এল-নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সাল ইতিহাসের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর এবং ২০২৪ সাল এ যাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হয়ে উঠেছিল। ওই সময় বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ববর্তী ১৮৫০-১৯০০ সময়ের গড়ের তুলনায় প্রায় ১.৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল-নিনো চরম আকার ধারণ করে। তবে, এর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব কিছুটা পরে অনুভূত হয়।
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, এল-নিনোর প্রভাবে বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে। একইসঙ্গে বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে পারে খরা ও বন্যার ঝুঁকি। মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থা, অর্থনীতি, বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের জীবনযাত্রায়।
ইতোমধ্যেই এবারের এল-নিনো কিছু অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মধ্য আমেরিকায় খরার কারণে পশুপাখি ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এটি চিন্তার বিষয়, কারণ এল-নিনো সাধারণত এই অঞ্চলে কম বৃষ্টিপাত ও বেশি তাপমাত্রা আনয় করে।
বাংলাদেশের জন্য এল-নিনোর প্রভাব বহুমুখী হতে পারে। শীতকালীন ফসল উৎপাদন, জল সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যে এর প্রতিফলন পড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে। এক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে ৭০ বছরের মধ্যে হারিয়ে যাবে শীত — এই প্রেক্ষাপটে এল-নিনোর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ও গৈরসরকারী স্তরে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কৃষি, জলসম্পদ ও আপদ ব্যবস্থাপনা বিভাগগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। গ্রামীণ কৃষকদের জন্য খরা-সহিষ্ণু ফসলের জাতের প্রচার, সিঁচাই ব্যবস্থা উন্নতি ও জল সংরক্ষণে জোর দেওয়া প্রয়োজন। নগর এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি মোকাবিলায় সবুজ আওতা বাড়ানো ও জল निकাস ব্যবস্থা দুরুস্ত করা জরুরি।
ডব্লিউএমওর এই সতর্কতা বিশ্বজুড়ের নীতিনির্মাতাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তন ও এল-নিনোর যৌথ প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও স্থানীয় কর্মকান্ডের সমন্বয় অপরিহার্য। বাংলাদেশসহ সকল ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এটি একটি ওয়েক-আপ কল।