চট্টগ্রামের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল 'চ্যানেল টুয়েন্টিফোর'-এর আবাসিক সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল পারভেজকে পুলিশের তালিকাভুক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগা কর্তৃক প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় দেশের সাংবাদিক সম্প্রদায়ে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব একটি আকস্মিক বিবৃতি জারি করে এই ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে চিহ্নিত করেছে। ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে অভিযুক্ত ওয়াকিল হোসেন বগাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
প্রেস ক্লাবের বিবৃতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, একজন পেশাদার ও নির্ভীক সাংবাদিককে এই রকম হুমকি প্রদান কেবল কোনো ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; এটি গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নেতৃবৃন্দ দৃঢ় প্রত্যয় জানিয়েছেন যে, ভয়ভীতি দেখিয়ে বা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব ও সত্য প্রকাশ থেকে বিরত রাখা যাবে না। সাংবাদিকরা কেবল জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাংবাদিকদের অবস্থান অবিচল থাকবে।
এই ঘটনা একা নয়, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হুমকি, হামলা ও অভিযোগের ঘটনা বেড়েছে है। প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দ অনতিবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। একই সাথে চট্টগ্রামে কর্মরত সকল গণমাধ্যমকর্মীর পেশাগত ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। সাংবাদিক সম্প্রদায়ের মতে, এই ধরনের ঘটনা যদি অবিলম্বে রোধ করা না হয়, তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গভীর সংকটে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গ্যারান্টি দিয়েছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৩ সালে 'সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিরাপত্তা আইন' প্রণীত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনগুলো কতটুকু কার্যকর হচ্ছে, সেটা প্রশ্নের বাইরে নয়। গত বছরের तरह এই বছরও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এই দাবি আসলে সকল সাংবাদিক সংগঠনের সাধারণ চেয়নাকে প্রতিফলিত করছে।
চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের সাংবাদিক সংগঠনগুলিও এই ঘটনাকে তীব্র নিন্দা করেছে। বাংলাদেশ ফেডারেল യুনিয়ন অফ জার্নালিস্টস (বিএফইউজে), নেশনাল প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সহ বিভিন্ন সংগঠন একসুরে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও #JusticeForKamalParvez হ্যাশট্যাগ দিয়ে সাংবাদিকরা এককথায় সাংবাদিকের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন।
গণতন্ত্রে গণমাধ্যমকে 'চতুর্থ স্তম্ভ' বলা হয়। কিন্তু এই স্তম্ভটি যদি হুমকি ও ভয়ের সায়ে কাজ করতে বাধ্য হয়, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি কমজোর হয়। কামাল পারভেজের মামলা শুধু একজন সাংবাদিকের নয়, এটি সকল সত্যান্বেষী সাংবাদিকের প্রতীক। সরকার, পুলিশ প্রশাসন ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব হলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সময় সাংবাদিকদেরও পেশাগত নীতিমালা মানতে হবে।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এই কঠোর অবস্থান সাংবাদিক সম্প্রদায়ের একতা ও সংকল্পশক্তির প্রতিফলন। এখন দেখা যাক প্রশাসন কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই মামলায় পদক্ষেপ নেয়। সাংবাদিক কামাল পারভেজ ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যমকর্মীদের আশা, ন্যায় বিজয়ী হবে।