
ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সম্ভাব্য নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি পুনর্গঠনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করার কাজ করছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতির পাশাপাশি ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন অভিযান থেকে বিরত রাখার কূটনৈতিক ও সামরিক চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে নিজেদের অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সংগঠিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে বিস্তৃত পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হवाले প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি কর্মকর্তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশেষ করে ইরাকের মধ্য দিয়ে অনুপ্রবেশ বা সেখানে থাকা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে হামলা চালানোর আশঙ্কা রয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ঘটনাকে তেহরানের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে।
আঞ্চলিক পার্শ্বপ্রেক্ষাপটে, নতুন সংঘাত শুরু হলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা সহ অঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হতে পারে বলে ইরান আরব কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিদের হামলার হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বড়দিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা আছে। আগের মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ইরান সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা জারি রেখেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ড্রোনের ভান্ডার সম্প্রসারণেও কাজ চলছে। গত মার্চে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিউয়াহু দাবি করেছিলেন যে, হামলায় ক্ষতির কারণে ইরানের পক্ষে আর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হবে না। তবে এপ্রিলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং অন্যান্য প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র বাংকার মেরামত করতে পারেছে এবং ধারাবাহিক হামলার পরও সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের সক্ষমতা দেখিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখেছে, ইরান পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার চারপাশে মাটির অস্থায়ী ঢিবির মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। মনে হচ্ছে, সম্ভাব্য স্থল হামলা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পারমাণবিক স্থাপনা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বাংকারগুলোর সুরক্ষাও তেহরান জোরদার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের ইরান কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরিচালক বেহনাম বেন তালেব্লু মন্তব্য করেছেন যে, কথায় ও কাজে—দুইভাবেই ইরান পরবর্তী যুদ্ধের জন্য সক্রিয়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য জনগণকেও প্রস্তুত করছে ইরানি সরকার। শিশুদের কাছে যুদ্ধের গল্প পড়ে শোনাতে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের পাঠানো, কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণের বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন সমাবেশ আয়োজন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চলা পরবর্তী দফার হামলা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান বিভিন্ন ধরনের বিমান হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুমকিও অব্যাহত রেখেছে দেশটি।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানির দামে সংকটের প্রভাব সীমিত রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটনের এসব উদ্যোগের মধ্যেও ইরানের সঙ্গে বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি আবারও সামরিক অভিযান শুরু করে, তা আগের হামলাগুলোর তুলনায় কতটা কার্যকর হবে তা অনিশ্চিত। আগের সংঘাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুনর্গঠনের পাশাপাশি অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার সামর্থ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে। আগের হামলায় মার্কিন স্থাপনা ও উড়োজাহাজের ক্ষতিসহ সামরিক সরঞ্জাম অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ইরানি কর্মকর্তাদের সামরিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নতুন করে হামলা চালানোই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। বরং সেই অভিযান ইরানকে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং متحد দেশগুলোর জন্য হুমকি তৈরি করা থেকে বিরত রাখতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।