
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সংগ্রহ করেছে। তদন্ত সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। তবে দীপের দেওয়া এসব তথ্য এখনো যাচাই করছে পিবিআই।
তাহসিফের মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ভাইতুল্য বন্ধু দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তির তুরাগ নদীর তীর পরিদর্শন করেন তদন্তকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তাঁরা নির্দিষ্ট একটি স্থানে কথা বলছিলেন। এ সময় পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান। তিনি তুরাগ তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, দীপ নানা তথ্য দিয়েছেন। তবে সেসব তথ্যের সবকিছু তাঁরা বিশ্বাস করছেন না। প্রতিটি তথ্য ও ঘটনার বিবরণ যাচাই করা হচ্ছে। পুলিশের পোশাক পরা ব্যক্তিরা তাঁদের ধাওয়া করেছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনকে দেখে তাঁরা দৌড়ে পালান। তবে ওই দুজন কারা, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়। পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, নদী থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে। এর মালিকানা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের ধারণা, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাহসিফ যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছিলেন, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি সেটি হতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজেও তাঁকে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুল ইসলাম জানান, শুক্রবার ভোররাতে পুলিশের টহল দল ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সেনাকল্যাণ ভবনসংলগ্ন হোন্ডারোডে পরিত্যক্ত অবস্থায় মোটরসাইকেলটি পায়। পরে সেটি থানায় নিয়ে আসা হয়। পিবিআইয়ের তদন্ত দল থানা থেকে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায়।
তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, তুরাগ তীরের ২৯ নম্বর পিলারের আড়ালে তিনি লুকিয়েছিলেন। ওই স্থান থেকে নদীর দূরত্ব প্রায় ৫০ গজ। অন্যদিকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয় ডিএমপির উত্তরখান এলাকার রাজাবাড়ি ঘাট থেকে। ফলে মাজার বস্তির তুরাগ তীর থেকে তাহসিফের মরদেহ কীভাবে রাজাবাড়ি ঘাটে পৌঁছাল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা একটি ভিডিওতেও তাঁকে ২৯ নম্বর পিলারের আড়ালে থাকার কথা বলতে শোনা যায়। তাঁর দাবি, তিনি পিলারের আড়ালে ছিলেন এবং তাহসিফ কিছুটা পেছনে একটি ভবনের সিঁড়িতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় পুলিশের পোশাক পরা দুজন ধাওয়া করলে তিনি আত্মগোপন করেন।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ধাওয়া করা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং মরদেহ রাজাবাড়ি ঘাটে পৌঁছানোর ঘটনাহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পিবিআই ও নৌ পুলিশ। সংস্থাটির অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, নৌ পুলিশ বাংলাদেশ পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। তাদের তদন্তে সহায়তা করতেই পিবিআই ছায়াতদন্ত চালাচ্ছে। ঘটনাসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কিছু ফুটেজ বিভ্রান্তিকর হওযায় সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।