
আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, কাভার্ড ভ্যানে আগুন; গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সাভারের আশুলিয়া এবং গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। সোমবার (২ নভেম্বর) আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের একাধিকবার সংঘর্ষের খবর রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে বলে জানা গেছে। বিক্ষোভের মধ্যে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে, যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
সোমবার সকাল থেকে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বেশ কিছু কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, একাধিক কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমেছেন এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা চলছে। এএসপি আরও দাবি করেছেন, আশুলিয়ার আর্টিস্টিক ডিজাইন লিমিটেড প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকরা হামলা চালিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন। এ বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত, স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি।
বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে আশুলিয়ার শারমিন গ্রুপের একটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গাজীপুরে চতুর্থ দিন অবরোধ
অন্যদিকে, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চতুর্থ দিনের মতো ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন। সোমবার সকাল থেকে চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, সফিপুর ও আশপাশের এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক দখল করে থাকেন। এর ফলে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরুল করিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষে শ্রমিক ও বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রমমন্ত্রীর আহ্বান
শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি মেনে সরকার তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য ছয় সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। রোববার (১ নভেম্বর) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কারখানায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী।
বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। সদস্যদের মধ্যে নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মসলেহ উদ্দিন আহমদ রয়েছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামসুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়েডস ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার নিয়োগ পেয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে এবং শনিবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রমমন্ত্রী। এই আলোচনার পর রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করবে।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী মাস থেকে শ্রমিকরা বর্ধিত মজুরি পেতে শুরু করেন। সাধারণত পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে এই খাতের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হতো। তবে ২০২৬ সালে শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের ব্যবধান পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।
মজুরি বোর্ড গঠন হলেও শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। বোর্ডের সুপারিশের পরেই নতুন মজুরি কাঠামো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত জানা যাবে। এর মাঝে আশুলিয়া, সাভার, মিরপুর ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসंतোষ অব্যাহত রয়েছে।