
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার মাথিন এলাকায় অবস্থিত একটি প্রাচীন কূপ আজও স্থানীয় ইতিহাস ও এক অদ্ভুত প্রেমগল্পের স্মৃতি সংরক্ষণ করছে। সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ের সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত এই सीমান্ত শহরের হৃদয়ে বসে এই কূপটি শুধু জল সংগ্রহের একটি স্রোত নয়, বরং এটি ব্রিটিশ আমলে জমিদারকন্যা মাথিন ও পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজের অমর প্রেমের একটি বেলা স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে এসে থাকেন, যা টেকনাফের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অনন্য অংশ।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রেমের গল্প
ব্রিটিশ শাসনকালে টেকনাফ এলাকায় জমিদারি প্রথা ছিল। তখন মাথিন এলাকার জমিদারের কন্যা ছিলেন মাথিন। তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও মেধাবী ছিলেন। একদিন এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেলেন যুবক ধীরাজ। কর্তব্যের সিলসিলে ধীরাজ মাথিনের বাসায় আসা-যাওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে পরিচয় গাড় হয়ে উঠে প্রেমে পরিণত হয়। কিন্তু সমাজ ও পরিবারের বাধায় তাদের বিবাহ সম্ভব হয়নি। আহত মাথিন শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন বলে কাহিনী পাওয়া যায়। ধীরাজও তার বিযোগে পাগল হয়ে যান। এই করুণ গল্প স্থানীয় মানুষের মুখশ্রুতিতে আজও জীবন্ত।
কূপটির স্থাপনা ও স্থাপত্য
মাথিনের স্মৃতিতে এই কূপটি স্থাপন করা হয়েছিল। ইট ও চুনে নির্মিত এই কূপটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো। কূপটির গাড়ি প্রায় ১০ ফুট ও গভীরতা প্রায় ৩০ ফুট। চারপাশে প্রাচীর থাকা হলেও সময়ের প্রহারে তা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে কূপটির চারপাশে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বাঁশের বেড়া ও বসা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটন বোর্ডের উদ্যোগে এখানে ছোট একটি উদ্যান ও বেন্চ বসানো হয়েছে যাতে পর্যটকরা বসে কিছুক্ষণ বিতান করতে পারেন।
পর্যটক আকর্ষণ ও বর্তমান অবস্থা
টেকনাফ আসা পর্যটকরা সমুদ্র সৈকত ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ যাওয়ার পথে এই ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে এসে থাকেন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের যুবক-যুবতী ও ইতিহাস অনুরাগীরা এই কূপকে ঘেরে ছবি তোলা পছন্দ করেন। স্থানীয় গাইডরা তাদের গল্প শোনিয়ে দেন। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৫০ হাজার পর্যটক এখানে এসেছিল। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কূপটির অবস্থা কিছুটা জর্জরিত হয়ে গেছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন, সরকারি স্তরে এটি স্মৃতি সংরক্ষণ ঘোষণা করা হোক এবং উন্নত করা হোক।
টেকনাফের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
মাথিনের কূপ ছাড়াও টেকনাফে আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। নাফ নদীর তীর, শাহ পড়ির দ্বীপ, হিমছড়ি সৈকত, টেকনাফ গেম রিজার্ভ ইত্যাদি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আদিবাসী সংস্কৃতি পর্যটকদের মনে বসে যায়। যারা ইতিহাস ও সংস্কৃতির সংগম চান, তাদের জন্য টেকনাফ একটি আদর্শ গন্তব্য।
স্থানীয় মানুষের অভিমত
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী (৬৫) বলেন, “আমরা ছোট বেলা থেকে এই কূপের গল্প শুনি বড় হয়েছি। এটি আমাদের গ্রামের গৌরব। সরকার যদি এর রক্ষায় মনোযোগ দেন তবে এটি বড় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।” অন্যদিকে, কলেজ ছাত্র রহিমা আক্তার বলেন, “আমরা বন্ধুদের সাথে এখানে আসি। গল্প শুনে মন ভরে যায়। এখানে বসে কিছুক্ষণ শান্তি পাই।”
পৌঁছানোর পথ ও সুবিধা
ঢাকা থেকে টেকনাফ যাওয়ার জন্য সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে। সয়েকদিন আগে রেলওয়ে যোগাযোগও শুরু হয়েছে। টেকনাফ সদর থেকে মাথিনের কূপ প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বে। সിടিএনজি বা মোটরসাইকেল ভাড়া করে যাওয়া যায়। কূপের পাশে ছোট কিছু হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে খাবার ও বিশ্রামের সুবিধা পাওয়া যায়। তবে রাতে ठাকার জন্য টেকনাফ সদরে ফিরে যাওয়া ভালো।
টেকনাফের মাথিনের কূপ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি মানবিক সংবেদনা ও প্রেমের একটি অনশ্বর স্মৃতিস্তম্ভ। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে উজ্জ্বল হতে পারে। পর্যটন মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগে এই স্থানটি আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটক-বান্ধব করা সম্ভব।
