
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য শুক্রবার পর্যবেক্ষণ করেছেন, কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কারো বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের নেই। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের একজন বাসিন্দাকে আটক করে বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে দায়ের রিট আবেদনের শুনানিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
আবেদনকারী ব্যক্তির স্ত্রী আদালতে আপীল করেছিলেন যে, কয়েকজন প্রতিবেশীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি সন্দেহের কারণে তাঁর স্বামীকে আটক রাখা হয়েছে এবং দেশান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্ত্রীকে আটক করা হয়নি। আবেদনকারীর আইনজীবী রবিউল ইসলাম আদালতকে জানিয়েছেন, তাদের মোকেয়ল গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে আটক আছেন। আটক করার পেছনে প্রতিবেশীদের বক্তব্য ছাড়া কোনো শক্ত ভিত্তি দেখা যায়নি।
শুনানির সময় বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ও নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কীভাবে কারও নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের নাগরিকত্বের পক্ষে নথিপত্র উপস্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও বিচারপতি জানতে চান। আদালতকে জানানো হয়, দেশান্তরের নির্দেশটি আপাতত স্থগিত রয়েছে।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য পর্যবেক্ষণ করেন, কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাঁর বক্তব্য শোনা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। কেবল কয়েকজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঘোষণা করা যায় না। তিনি আরও প্রশ্ন করেন, কয়েক দশক ধরে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হলেও, সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তিকে কি ফিরিয়ে পাঠানো সম্ভব? নাগরিকত্ব নির্ধারণে একটি স্পষ্ট ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রাজ্য সরকারের পক্ষে উপস্থিত অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার যুক্তি দেন, আটক ব্যক্তি জাল নথির মাধ্যমে ভোটার কার্ড, আধার ও প্যান কার্ড সংগ্রহ করে থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে আদালতে উত্থাপিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্বের প্রশ্ন নিষ্পত্তির জন্য যথাযথ যাচাই প্রয়োজন। পরের ধাপে বিচারপতি মামলাটি উপযুক্ত বেঞ্চে শুনানির ব্যবস্থা করতে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর অনুরোধ জানান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক ও বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে আদালত বা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ ছাড়াই তাঁদের সীমান্তের ওপরে পাঠানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রতিটি ঘটনার নথিপত্র আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
গত জুলাইয়ে আদালতের নির্দেশে মালদার মহদিপুর স্থলবন্দর দিয়ে চারজন ভারতীয় নাগরিক—যাঁদের মধ্যে একজন নারী ও দুটি শিশু ছিলেন—প্রায় এক বছর বাংলাদেশে থাকার পর ভারতে ফিরে যান। নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারতে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে। আদালতের বক্তব্যে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, প্রমাণ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়ার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
